টাঙ্গাইল এর সম্ভাবনাময় পণ্য কাঁঠাল

উদ্যোক্তা

কাঁঠাল আর মুড়ি হয়না এমন জুড়ি….. তাইনা? শুধু কি কাঠাল আর মুড়ি? কাঠালের সাথে পান্তা ভাত, চিড়া, খই সব ই কিন্তু বাংগালীয়ানায় ভরপুর ।

যুগ যুগ থেকে কাঠাল আমাদের গ্রাম বাংলার সাথে মিশে আছে। কাঠাল সবথেকে বড় ফল, কাঠাল আমাদের জাতীয় ফল। খুব ছোট বেলায় ভাবতাম এত ফল থাকতে কাঠাল ই কেন জাতীয় ফল আমাদের ।

আসলে কাঁঠাল এমন একটা ফল যার ফেলনা নয় কোন কিছুই। ফল থেকে শুরু করে বিঁচি,, আবার কাঁঠাল কাঠ খুব দামী একটা কাঠ,, ওদিকে বাদ যায়না পাতা কিংবা কাঠালের ছাল ও ছোবরা, গো খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যত্ন নিতে হয় কম কিন্তু ফলন পাওয়া যায় অনেক বেশি। আবার সাধ্যের মাঝে জন্য খেতে পারে সবাই এই ফল। এই ফলকে তাই গরীবের ফল ও বলা হয়।

দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম ঘাট এবং মালয়েশিয়ার বৃষ্টি অঞ্চল কাঁঠালের উৎপত্তি স্থান ধরা হলে ও ভারত ও বাংলাদেশে কাঁঠালের চাষ হয় সবথেকে বেশি। বিশ্বে কাঠাল উৎপাদনে ভারতের পরেই বাংলাদেশ এর অবস্থান।

বাংলাদেশে প্রায় সব জায়গাতে ই কম বেশি কাঁঠাল দেখা যায় কিন্তু মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় কাঠাল চাষের জন্য সেরা। এই এলাকার উঁচু ও লালমাটিতে কাঠালের ফলন খুব ভালো হয়৷ মধুপুর এবং এর আশেপাশে, পচিশমাইল, জলছত্র, ধলাপারা, কান্দুরবাজার, কুতুবপুর, বড়চোনা, পিরোজপুর, চাপাইদ, কুড়াগাছা, পীরগাছা, মমিনপুর, চাঁনপুর, শিরিসটাল, শোলাকুড়ি, অরণখোলা, নয়নপুর, রসুলপুর, রাজাবাড়ি, টেলকি, সাগরদিঘী, সখিপুর, ঘাটাইল, ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর পরিমাণে কাঠাল জন্মে। টাঙ্গাইল এ প্রায় ১৫০০০ একর জমিতে কাঠাল ফলে এবং মধুপুরে ই এর মাঝে প্রায় ১১০০০ একর ভূমি জুড়ে শুধু কাঠালের ফলন হয়।

কাঁঠালের রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। যেমনঃ

◑ কাঁঠালে ফ্যাট কম। তাই এই ফল খেলে ওজন কমে।

◑ কাঁঠাল এ প্রচুর পরিমাণ পটাশিয়াম রয়েছে যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।

◑ এতে ভিটামিন এ আছে যা রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।

◑ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

◑ দাঁতের মাড়িকে শক্ত করে।

◑ কাঁঠাল হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

◑ কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম আছে যা হাড় কে শক্ত করতে সাহায্য করে।

◑ কাঁঠাল খেলে কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর হয়।

◑ একেবারে ছোট্ট বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সবার জন্য এই ফল খুব কার্যকরী।।।

এত এত পুষ্টি গুণ সমৃদ্ধ একটি ফল কিন্তু সহজলভ্যতার কারণে পায়না ন্যায্যমূল্য৷

কাঁঠাল মৌসুমি ফল হওয়ার কারণে সারা বছর পাওয়া যায়না। মে থেকে জুলাই কাঠাল এর সিজন। তবে এর পুষ্টিগুণের কথা ভেবে ই কৃষিবিজ্ঞানীরা এই ফল সারা বছর পাওয়ার উপযোগী জাত উদ্ভাবন করছেন। এর মধে বারি ১, বারি ২, বারি ৩ কাঁঠাল পাওয়া যাবে বছরের বিভিন্ন সময় এবং সারাদেশ ই এই গাছের জন্য উপযুক্ত।

আসলে আমাদের দেশে কাঁঠাল এত ই সহজলোভ্য যে এর বিনিময় মূল্য একেবারেই নগন্য বলা যায়। এত বড় ফল অথচ দাম নাই। তবে উন্নতমানের কাঁঠাল যেহেতু সারাবছর পাওয়া যাবে তাই এর দাম পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন সবাই।

টাঙ্গাইল এর ঘাটাইল এ এত কাঠাল পাওয়া যায় যে অনেক কাঁঠাল বাজার পর্যন্ত ও নিতে পারেনা অনেকেই। বাজারে নিলে ও এত এত কাঠালের ভীড়ে দাম একেবারেই কম এবং এমন ও হয় যে রাস্তাঘাট কিংবা এখানে ওখানে পরে আছে কাঁঠাল বা এর বিচি। মধুপুর এর পঁচিশমাইল কিংবা জলছত্র বাজারে গেলে দেখা যায় সাড়ি সাড়ি কাঁঠাল নিয়ে ভ্যান বা সাইকেল করে দাঁড়িয়ে আছে পাইকাররা৷ ঢাকা বা দূর দূরান্ত থেকে পাইকার রা এসে কাঠাল কিনেন। অনেকে আবার গোখাদ্য হিসেবে ও কাঠাল কিনে থাকে। এ এলাকায় কাঠালের কোন সু্ষ্ঠু বিপনন কেন্দ্র নাই, নাই কোন প্রক্রিয়াজাত করণের ব্যবস্থা , যার কারণে প্রতি বছর মৌসুমে কাঁঠাল নিয়ে বিপাকে পড়ে চাষীরা।

তবে কাঁঠাল এমন ফল যা পাকা যেমন খাওয়া হয় তেমনি খাওয়া হয় কাচা কাঠাল ও। কাচা কাঁঠালের তরকারী তো অমৃত, কাঁঠালের রোয়া বা কোষা গরুর মাংসের মত করে সিদ্ধ করলে ও তা ভীষণ ই সুস্বাদু একটা খাবার। কাচা কাঁঠালের বিচির ভর্তা যেমন মজা তেমনি বিচি বাদামের মত করে ভেজে খেতে ও মজা। কাঁঠাল এর রস দিয়ে কাঁঠালস্বত্ত্ব ও বানানো যায়। যার আগা গোড়া ই এত উপকারী সেই কাঁঠাল ও পচে যায়, নষ্ট হয় ফেলে দিতে হয়, ন্যায্যমূল্যের অভাবে থুবড়ে পরে আছে এই কাঠাল, মাথা চাড়া হয়ে উঠতে পারছেনা এই সেক্টর অথচ শুধু কাঁঠাল ই হতে পারে আমাদের দেশের জন্য অনেক বড় একটা সম্ভাবনা।

বর্তমানে ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, শ্রীলঙ্কা সহ অনেক দেশ কাঁচা কাঁঠাল ফ্রেশ কাট সবজি হিসেবে, বা কাঁঠালের চিপ্স হিসেবে, শুকনা কাঠাল হিসেবে কিংবা ক্যানজাত করে, হিমায়িত কাঁঠাল হিসেবে সরবরাহ করছে বিভিন্ন সুপারশপ এ। আবার রপ্তানি ও করছে আরব-আমিরাত, জাপান কোরিয়া, ইউরোপ আমেরিকা সহ অনেক দেশে। ভিয়েতনাম, শ্রীলংকায় গড়ে উঠে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প৷ অথচ আমাদের দেশ এত কাঠালে সমৃদ্ধ এবং নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময় কিন্তু এদিক থেকে কত পিছিয়ে আছে। কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করতে পারলে এটা আমাদের জন্য হবে খুব ই সম্ভাবনা ময়। একটা বড় শিল্প গড়ে উঠতে পারে শুধু কাঁঠাল কে কেন্দ্র করে। এত বহুল ব্যবহৃত একটি ফল রাস্তা ঘাটে পঁচে থাকে৷ এটা আমাদের জন্য সত্যিই শোচনীয়।

এক্ষেত্রে যদি কিছু উদ্যোক্তা এগিয়ে আসে তাহলে ই এই কাঁঠালকে ঘীরে ভবিষ্যৎ অন্যরকম হতে পারে৷ বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে কাঁঠাল বাহিরে রপ্তানি করা হয় তবে সেটা কোন প্রক্রিয়াধীন না, অথচ শুকনো বা ক্যান এ স্টোর করা যায় এমন প্রক্রিয়াধীন হলে হলে তা দিব্যি রপ্তানি করা যাবে এবং সারাবছর খাবার উপযোগী হবে।।

ই-কমার্স এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমরা নিজেদের ঐতিহ্য, নিজেদের পণ্য নিয়ে খুব সহজে তুলে ধরতে পারি, প্রচার করতে পারি, প্রসার ও পরিধি তাহলে বাড়বে ই। কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করণ এর দিকে একক ভাবে বা টীমভাবে অনেকেই এগিয়ে গেলে যেমন কর্মসংস্থান হবে তেমনি নতুন একটা অর্থদানকারি খাত হবে আমাদের জন্য এবং রপ্তানির খাতে ও কাঁঠাল অবদান রাখতে পারবে৷

তবে এটা একেবারেই সত্য আমরা যে ই যেকোন সেক্টরে কাজ করিনা কেন লেগে থাকাত মানসিকতা নিয়ে ই এগুতে হবে। তাহলে অনেক মুখ থুবড়ে পরে থাকা পণ্য ও উঠে আসবে ই-কমার্স এর হাত ধরে ইন শা আল্লাহ।