রূপগঞ্জে নিহতদের ক্ষতিপূরণের আদেশ চাইলে হাইকোর্ট যা বললেন

বাংলাদেশ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বলেছেন হাইকোর্ট। অ্যাটর্নি জেনারেলকে এ নির্দেশনা দিয়ে উচ্চ আদালত বলেছেন স্বাস্থ্য সচিব ও শ্রম সচিবের সঙ্গে কথা বলতে। সেই সঙ্গে কতজন শ্রমিক আহত, চিকিৎসাধীন তার একটি তালিকা প্রকাশ করার কথাও বলেছেন আদালত।

অগ্নিকাণ্ডে হতাহত শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা এক রিট আবেদনে আইনজীবী সারা হোসেন আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশ চাইলে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম রোববার রাষ্ট্রপক্ষকে এ নির্দেশ দেন। 

রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী জেড আই খান পান্না, সারা হোসেন, অনীক আর হক, মো. শাহিনুজ্জামান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ও বিপুল বাগমার। 

আইনজীবী সারা হোসেন শুনানিতে অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিক মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরে ক্ষতিপূরণের জন্য হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চান। 

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম তখন বলেন, আমার এখতিয়ার খুব সীমিত। একক বেঞ্চ হওয়ায় আমি তো কোনো রুল দিতে পারব না। রূপগঞ্জের ঘটনার প্রসঙ্গে বিচারক বলেন, খুবই দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। সমস্ত জাতি আমরা শোকাহত। এ রকম ঘটনা আমরা আশা করি না। এ ঘটনায় তো ইতোমধ্যে একটি ফৌজদারি মামলা হয়েছে। এ মামলায় মালিকপক্ষের প্রায় সবাই গ্রেফতারও হয়েছে। বিচার তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এখন তদন্ত হবে।

ক্ষতিপূরণের নির্দেশনার ব্যাপারে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, ঠিকই আছে। ক্ষতিপূরণের হকদার বটে। যতটুকু দেখেছি ঘটনার দিন আমাদের শ্রম প্রতিমন্ত্রী গিয়েছিলেন। উনারা আহতদের সরকারিভাবে ২ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা বলেছেন। আজকে সকালে পত্রিকায় দেখেছি, শ্রম সচিব হাসপাতালে গিয়ে আহতদের কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলেছেন। সেটি পর্যাপ্ত কি না, জানি না। আর একটা বিষয় হলো, যে মৃত্যুগুলো হয়েছে, এখন পর্যন্ত ৫২টি লাশের মধ্যে মাত্র একটা লাশের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে হস্তান্তর করতে পেরেছে। বাকি ৫১টি লাশ চিহ্নিত করাই সম্ভব হচ্ছে না। ডিএনএ টেস্ট হবে এবং এই প্রক্রিয়া ২১ দিনের আগে সম্পন্ন হবে না। মৃতদেহগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত চিহ্নিত না হচ্ছে, যতক্ষণ লাশগুলো তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছে না যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কীভাবে ক্ষতিপূরণ নির্ণয় করা হবে। আপনাদের (রিট আবেদনকারীদের) একটু অপেক্ষা করা দরকার। 

বিচারপতি বলেন, গত বছর ইউনাইটেড হাসপাতালের আগুন লাগার পর যেসব রোগীর মৃত্যু হয়েছিল, তাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে রুল জারি না করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট।  পরে আপিল বিভাগে প্রশ্ন উঠেছিল, রুল জারি না করে টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারি কি না। পরে বোধহয় নিয়মিত মামলা ফাইল করে রুল জারি করে তারপর সেটেল (মীমাংসা) হয়েছে। এক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের কোর্টের সীমাবদ্ধতা আছে।

রিটকারীদের উদ্দেশে আদালত বলেন, আমার মনে হয় এটাই বোধয় প্রথম যে এ রকম একটি ঘটনা ঘটার পর মালিকপক্ষকে খুব দ্রুত বিচারের আওতায় আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। কাজ হচ্ছে, দেখা যাক। ক্ষতিপূরণের বিষয়ে একটু সময় দেন, আমার মনে হয় যে নিয়মিত কোর্ট চালু হলে নিয়মিত মামলা ফাইল করেন। আইনজীবী  রেজাউল করিম এ সময় বলেন, চিকিৎসার খরচ যেন কোম্পানি বহন করে এ রকম একটা নির্দেশনা দেন। তাদের অবহেলাতেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। 

তখন বিচারক বলেন, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সবাই তো এখন জেলখানায়। আর কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছে তারা খরচ দেবে। না দিলে আসবেন, বিষয়টা আমরা দেখব। একটু অপেক্ষা করেন। সময় যেতে দিন। 

আইনজীবী রেজাউল করিম বলেন, শ্রম আইনের ৩৪ ধারা অনুযায়ী শিশু এবং কিশোরদের নিয়োগই দেওয়া যায় না। তারা সেটি লঙ্ঘন করেছে। বিচারক তখন বলেন, এটাতে তো দ্বিমত পোষণ করছি না। কতজন শিশু আহত হলো, কতজন শিশু নিহত হলো, আমার মনে হয় একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পেয়ে যাব। তখন ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আমরা দেখব। এর মধ্যে মৃতদেহগুলো চিহ্নিত হয়ে যাক।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে শনিবার রাতে হাইকোর্টে এই রিট আবেদন করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির পক্ষে রিট আবেদনটি করেন আইনজীবী মো. শাহিনুজ্জামান।

আবেদনে নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ কোটি টাকা এবং আহত শ্রমিকদের প্রত্যেককে ৩৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। তবে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা করে দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয় আবেদনে। 

এ ছাড়া রিট আবেদনে হাসেম ফুডস লিমিটেড ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হাসেম এবং তার পারিবারের অন্যান্য সদস্যদের ব্যাংক হিসাব চিহ্নিত করে- তা ফ্রিজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি নির্দেশনাও চাওয়া হয়।